পোষা বিড়ালের ভ্যাক্সিন: কোনটা দরকার, কখন দিতে হবে এবং কেন এটা এত জরুরি
আপনার বাড়িতে যদি একটা লোমের গোলা থাকে যে আপনার বিছানা দখল করে, আপনার ল্যাপটপের উপর শুয়ে থাকে আর রাত ৩টায় “আমি ক্ষুধার্ত” বলে চিৎকার করে, তাহলে আপনি জানেন বিড়াল পালনটা কতটা আনন্দের—আর কতটা দায়িত্বের। এই দায়িত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভ্যাক্সিনেশন। সঠিক সময়ে সঠিক ভ্যাক্সিন না দিলে আপনার প্রিয় বিড়ালটা গুরুতর অসুখে পড়তে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে।
বিড়ালের জন্য কোন কোন ভ্যাক্সিন সবচেয়ে জরুরি?
ভেটেরিনারি চিকিৎসকরা দুই ধরনের ভ্যাক্সিনের কথা বলেন:
১. Core Vaccines (যেগুলো প্রতিটি বিড়ালেরই দরকার)
২. Non-core Vaccines (যেগুলো জীবনযাপনের ধরনের ওপর নির্ভর করে)
Core Vaccines (অবশ্যই দিতে হবে):
- FVRCP (একসঙ্গে তিনটা রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে)
- Feline Herpesvirus (FHV-1) → বিড়ালের সর্দি-কাশি, চোখ উঠা
- Feline Calicivirus (FCV) → মুখে ঘা, জ্বর, খুঁড়িয়ে হাঁটা
- Feline Panleukopenia (FPV) → বিড়ালের “ডিস্টেম্পার” বলা হয়, অত্যন্ত মারাত্মক, রক্তাল্পতা ও ডায়রিয়া করে, বাচ্চা বিড়ালের মৃত্যুহার ৯০% পর্যন্ত
- Rabies (জলাতঙ্ক)
বাংলাদেশ, ভারতসহ প্রায় সব দেশেই আইনত বাধ্যতামূলক (বিশেষ করে যদি বিড়াল বাইরে যায় বা অন্য পোষ্যের সংস্পর্শে আসে)। মানুষের জন্যও মারাত্মক বিধায় এটা একেবারেই এড়ানো যায় না।
Non-core Vaccines (পরিস্থিতি অনুযায়ী):
- FeLV (Feline Leukemia Virus) – শুধুমাত্র যেসব বিড়াল বাইরে যায় বা একাধিক বিড়াল একসঙ্গে থাকে তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
- FIV (Feline Immunodeficiency Virus) – বাংলাদেশে এখনো ভ্যাক্সিন খুব একটা পাওয়া যায় না।
- Chlamydia, Bordetella – বোর্ডিং কেনেলে রাখলে বা ক্যাটারিতে থাকলে।
- Feline Infectious Peritonitis (FIP) – এখনো কার্যকর ভ্যাক্সিন বাজারে নেই।
কখন কোন ভ্যাক্সিন দেবেন? (সাধারণ সিডিউল – বাংলাদেশ/ভারত)
| বয়স | ভ্যাক্সিন | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ৬–৮ সপ্তাহ | FVRCP ১ম ডোজ | মায়ের দুধ থেকে পাওয়া ইমিউনিটি কমতে শুরু করে |
| ১০–১২ সপ্তাহ | FVRCP ২য় ডোজ + FeLV (প্রয়োজনে) | |
| ১৪–১৬ সপ্তাহ | FVRCP ৩য় ডোজ + Rabies ১ম ডোজ | এরপর থেকে বিড়াল বাইরে নিয়ে যাওয়া নিরাপদ |
| ১ বছর বয়স | FVRCP + Rabies বুস্টার | |
| তারপর প্রতি ১–৩ বছরে | FVRCP ও Rabies বুস্টার | ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী |
(উপরের টেবিলটা AAFP ও WSAVA-র সর্বশেষ গাইডলাইন অনুসরণ করে করা। কিছু ভেট ৩ বছর অন্তর FVRCP দেন, কিছু প্রতি বছর।)
বাংলাদেশে কোন ভ্যাক্সিন সহজে পাওয়া যায়?
- Nobivac Tricat Trio বা Felocell 3 → FVRCP
- Nobivac Rabies বা Rabixin → জলাতঙ্ক
- Purevax FeLV বা Leucogen → ফেলাইন লিউকেমিয়া (ঢাকা, চট্টগ্রামের ভালো ক্লিনিকে পাওয়া যায়)
দাম (২০২৫েব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত আনুমানিক):
- FVRCP: ৫০০–৮০০ টাকা/ডোজ
- Rabies: ৩০০–৫০০ টাকা
- FeLV: ১২০০–১৮০০ টাকা (যদি পাওয়া যায়)
ভ্যাক্সিন দেওয়ার আগে যা মনে রাখবেন
- বিড়ালটা সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতে হবে। জ্বর, ডায়রিয়া বা কাশি থাকলে পিছিয়ে দিন।
- ডিওয়ার্মিং (কৃমির ওষুধ) ১০-১৪ দিন আগে করে নিন।
- ভ্যাক্সিনের পর ২-৩ দিন বিড়ালকে বেশি স্ট্রেস দেবেন না, বাইরে নিয়ে যাবেন না।
- হালকা জ্বর বা ঘুমঘুম ভাব হতেই পারে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি মুখ ফুলে যায়, বমি করে বা শ্বাসকষ্ট হয় তাহলে তৎক্ষণাৎ ভেটের কাছে যান (অ্যানাফাইল্যাক্সিস হতে পারে)।
শেষ কথা
অনেকে ভাবেন “আমার বিড়াল তো ঘরের ভিতরেই থাকে, ভ্যাক্সিন লাগবে না”। এটা ভুল ধারণা। ভাইরাস আপনার জুতার তলা দিয়ে, জানালা দিয়ে, এমনকি আপনার কাপড়েও ঢুকতে পারে। Panleukopenia ভাইরাস পরিবেশে ১ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে! তাই ঘরে থাকা বিড়ালেরও Core ভ্যাক্সিন একেবারে বাধ্যতামূলক।
আপনার বিড়ালটা যদি আপনার পরিবারের সদস্য হয়, তাহলে তার স্বাস্থ্যের দায়িত্বও আপনার। একটু খরচ করে, একটু সময় দিয়ে তাকে দীর্ঘ, সুস্থ ও সুখী জীবন উপহার দিন।
ভালো ভেটেরিনারিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, সঠিক সিডিউল মেনে চলুন—আর আপনার লোমের গোলাটা আজীবন আপনার পাশে থাকুক মিয়াও মিয়াও করতে করতে।
নিরাপদে বিড়াল পালন করুন! 🐱💉
